অনন্যা সরকার, কর্ণাটক: স্বনির্ভর হওয়া বা নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার ইচ্ছা অনেকেই হয়তো মনের মধ্যে পোষন করেন, কিন্তু পুঁজির অভাবে তা বাস্তবায়িত করতে পারেন না। তবে ব্যবসা শুরু করার জন্য যে সবসময় বেশি টাকা লগ্নি করতে হবে, এমনটা নয়। এমনটাই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন কর্ণাটকের মহেশ হনুমন্ত কোলুর (Success Story of Mahesh Hanumant Kolur)। মাত্র ৫০০ টাকা দিয়ে শুরু করেন মাশরুমের (Mushroom) চাষ। বর্তমানে এই ব্যবসা থেকে মাসে প্রায় ৩ লাখ টাকা আয় করছেন এই সফল ব্যবসায়ী। আসুন তাঁর এই সাফল্যের কাহিনীটি জেনে নেওয়া যাক।
মাত্র ৫০০ টাকা দিয়ে ব্যবসার শুরু
মাশরুম চাষকেই পেশা বানাবেন বলে ঠিক করে মহেশ হনুমন্ত কোলুর বাগলকোট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিতে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। নিজের বাড়ির ১০ ফুট বাই ১০ ফুট আয়তনের একটি ঘর ব্যবহার করে তিনি ৬৫ টাকায় এক কেজি অয়েস্টার মাশরুমের স্পন বা বীজ কেনেন এবং মাশরুম চাষের জন্য ৩০টি ব্যাগ তৈরি করেন। মহেশ জানান খড়, স্পন ও পলিথিন ব্যাগ নিয়ে তাঁর মোট বিনিয়োগ ৫০০ টাকারও কম ছিল। ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা না থাকায় দশটি ব্যাগ নষ্ট হয়ে গেলেও, বাকি ব্যাগগুলো থেকে গড়ে ৫০০-৬০০ গ্রাম করে মোট ১০ কেজি মাশরুম পান মহেশ।
আরও পড়ুন: বাড়ি বাড়ি করতেন রঙয়ের কাজ, এবার হবেন ডাক্তার! NEET-এ অভাবনীয় সাফল্য সুরজের
প্রথমবারের উৎপাদিত মাশরুম তিনি স্থানীয় বাজারে ১৮০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। এর থেকে দু’মাসে তাঁর ২,০০০ টাকা আয় হয়। উপার্জিত পুনরায় ব্যবসায় বিনিয়োগ করে পরবর্তী ধাপের জন্য ২০০টি মাশরুমের ব্যাগ প্রস্তুত করেন। তাঁর এই প্রচেষ্টাও সফল হয়। তিন মাস পর মহেশ প্রায় ২৫০ কেজি মাশরুম পান, যা গড়ে ৩০০ টাকা কেজি দরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়।
২০২২ সালে তিনি অয়েস্টার মাশরুমের সাথে মিল্কি মাশরুমের চাষও শুরু মহেশ। তবে, মাশরুম উৎপাদন ছিল তাঁর ব্যবসার একটি অংশ মাত্র। নষ্ট হয়ে যাবার আগে সমস্ত ফসল বিক্রি করে দেওয়াটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর কাছে। টাটকা মাশরুম খুব বেশি দিন ভালো থাকে না, তাই বিক্রি না হলে ব্যবসার ক্ষতি হয়। তাই মহেশ এই ক্ষতি কমানোর জন্য বিক্রি না হওয়া মাশরুম দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী পণ্য তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমেই তিনি জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত অয়েস্টার মাশরুম, রাগি (দানাশস্য) ও গুড় দিয়ে তৈরি করেন মাশরুম কুকিজ।
আত্মীয়-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবদের এই কুকি খাওয়ানোর পর আশাব্যঞ্জক সাড়া পেয়ে তিনি নিশ্চিত হন যে, তাজা মাশরুম ছাড়াও মাশরুম দিয়ে তৈরি অন্যান্য পণ্যেরও চাহিদা রয়েছে। এরপর মহেশ প্রত্যেক সপ্তাহান্তে বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত ‘অর্গানিক ফার্মার্স মার্কেট’-এ অংশ নিতে শুরু করেন। সেখানে ক্রেতাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের ফলে তিনি ক্রেতাদের পছন্দের পরিবর্তনগুলি ভালো করে বুঝতে পারেন এবং এর ওপর ভিত্তি করে নিজের পণ্যের পরিসরকে আরও উন্নত করার প্রচেষ্টা করেন।
আরও পড়ুন: সরকারি চাকরি ছেড়ে চাষ, বছরে ৫০ লক্ষ আয় স্যুট ও বুট পরা কৃষক বিপিনের
মহেশের মাশরুম দিয়ে তৈরি প্রোডাক্টগুলি চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। তাই ২০২৩ সালে মহেশ ৩০ ফুট বাই ২০ ফুট আয়তনের একটি বিশেষ মাশরুম উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলেন। এখানে প্রায় ১,০০০টি মাশরুমের ব্যাগ রাখা যায়। বর্তমানে এই উৎপাদন কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কেজি অয়েস্টার ও মিল্কি মাশরুম উৎপাদিত হয়। আরবপ্রতিদিন সংগ্রহ করা প্রায় ৪৫ কেজি মাশরুম দিয়েই কুকি, আচার, চাকলি, মাশরুমের পাউডার এবং ড্রায়েড মাশরুম তৈরি করা হয়।
তাজা মাশরুম এখন প্রতি কেজি প্রায় ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়, কিন্তু প্রক্রিয়াজাত পণ্যগুলির দাম সেই তুলনায় অনেক বেশি। মহেশ ২০০ গ্রামের এক প্যাকেট মাশরুমের গুঁড়ো ৫০০ টাকায় এবং ২০০ গ্রামের এক প্যাকেট মাশরুমের আচার ১৫০ টাকায় বিক্রি করেন। মহেশ এখন আর শুধু পাইকারি বিক্রেতাদের ওপর নির্ভর করেন না। ফার্মার্স মার্কেট, স্থানীয় রিটেইল স্টোর, চায়ের দোকান থেকে হোটেল পর্যন্ত তাঁর প্রোডাক্ট পৌঁছে গেছে। ব্যবসা বাড়ানোর পাশাপাশি তিনি আগ্রহী মাশরুম চাষিদের প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকেন। নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সময় যে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন, তা তাদের সাথে ভাগ করে নেন।