১১ বছর বয়সে হয়ে যায় বিয়ে, দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে ৫ বারের চেষ্টায় NEET-এ সফল

অনন্যা সরকার, কলকাতা: কথায় বলে, আত্মবিশ্বাস ও সংকল্পের ডানায় ভর করে মানুষ জয় করতে পারে না, এমন কোনো কাজ নেই। রাজস্থানের চিতোরগড়ের বাসিন্দা রামলাল ভোইয়ের গল্পও (NEET UG Success Story of Ramlal Bhoi) যেন এই কথাটাই প্রমাণ করে। মাত্র ১১ বছর বয়সে বাল্যবিবাহ হয় তাঁর, ২০-তে হন সন্তানের বাবা। সংসার জীবনের জাঁতাকলে পিষেও নিজের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দেননি রামলাল। সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা (NEET)-এর মতো কঠিন পরীক্ষায় পাশ করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে কিনা না করা যায়। পঞ্চমবারের চেষ্টায় ২০২৩ সালে নিট পাশ করে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের দিকে এগিয়ে গিয়েছেন রাজস্থানের এই যুবক। আসুন তাঁর সাফল্যের এই কাহিনীটি জেনে নেওয়া যাক। 

বাল্যবিবাহ থেকে ডাক্তারি পড়ার স্বপ্নপূরণের কঠিন যাত্রা

রাজস্থানের চিতোরগড়ের জেলার ঘোসুন্দা গ্রামের বাসিন্দা রামলাল ভোই ছোট থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। পরিবারের সাথে ঘোসুন্দা গ্রামের বেদাচ নদীর তীরে একটি মাটির বাড়িতে বাস করতেন তিনি। নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পর্যাপ্ত পানীয় জলের মতো সাধারন সুবিধাগুলিও তাদের কাছে ছিল বিলাসিতার সমান। রামলালের বাবা কৃষি জমিতে শ্রমিকের কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন, আর মা পশুখাদ্য বিক্রি করে সাহায্য করতেন সংসারে। আরো চার ভাই বোন রয়েছে রামলালের। অত্যন্ত অভাবের সংসারেও নিজের স্বপ্নকে শেষ হয়ে যেতে দেননি তিনি, কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠা তাকে সাফল্য এনে দিয়েছে। 

আরও পড়ুন: NEET ক্র্যাক ঠেলাগাড়িতে সবজি বিক্রি করা মেয়ের, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন করবেন পূরণ

রামলালের ছেলেবেলা ছিল সংগ্রামে পরিপূর্ণ। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালীন ১১ বছর বয়সেই তাঁর জোর করে বাল্যবিবাহ করানো হয়। তবে, এই ঘটনা তার উচ্চশিক্ষিত হওয়ার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তার বাবা শুরুতে চাননি যে তিনি দশম শ্রেণীর পর পড়াশোনা করুন। এমন একটা সময় আসে, যখন অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার বাবা তাকে বকাঝকা করেন এবং পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বলেন। কিন্তু রামলাল তার লক্ষ্য থেকে একচুলও সরেননি, মনের মধ্যে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

রামলাল তার গ্রামের সরকারি স্কুল থেকে ৭৪ শতাংশ নম্বর নিয়ে দশম শ্রেণি পাস করেন। এরপর একাদশ শ্রেণিতে কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করতে উদয়পুর যান। উদয়পুরে পড়ার সময় তাঁর শিক্ষকরাই তাঁকে জীববিজ্ঞান (Biology) ও নিট পরীক্ষার সাথে পরিচিত করান। এর আগে তিনি জানতেনই না যে ডাক্তার হওয়ার জন্য নিট পরীক্ষায় পাস করতে হয়। সেই সময় থেকেই রামলাল ডাক্তার হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করেন এবং নিষ্ঠার সাথে প্রস্তুতি শুরু করেন। রামলাল একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়েন। এই সময়ে তিনি সমাজকল্যাণ বিভাগ দ্বারা পরিচালিত বিনামূল্যের আম্বেদকর হোস্টেলে থাকতেন বলে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন। 

আরও পড়ুন: বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভাঙাচোরা কেনা সুনীল হবেন ডাক্তার, NEET-এ মিলল অকল্পনীয় সাফল্য

রামলাল ২০১৯ সালে ৮১ শতাংশ নম্বর নিয়ে দ্বাদশ শ্রেণি পাস করেন। শুরুর দিকে তিনি কোনো কোচিং ছাড়াই নিজে নিজে পড়াশোনা করে নিটের জন্য প্রস্তুতি নিতেন। ২০১৯ সালের পরীক্ষায় ৭২০-এর মধ্যে ৩৫০ নম্বর, ২০২০ সালে ৩২০ এবং ২০২১ সালে ৩৬২ নম্বর পেয়েছিলেন, কিন্তু ডাক্তারি পড়ার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।

এরপর, তার শিক্ষকরা তাকে আরও ভালো প্রস্তুতির জন্য কোটায় কোচিং নেওয়ার পরামর্শ দেন। ছেলের স্বপ্ন পূরণ করতে বাবা ঋণ নিয়ে তাঁকে কোটায় পড়তে পাঠান। কোচিং-এর জন্য তাঁর প্রস্তুতি আরও ভালো হয়। এরপর ২০২২ সালের নিট পরীক্ষায় ৪৯০ নম্বর পান এবং অবশেষে ২০২৩ সালে, তার পঞ্চম প্রচেষ্টায় নিট পরীক্ষায় সফল হন রামলাল।

Leave a Comment