অনন্যা সরকার, কলকাতা: মহাকাশে পাড়ি দেওয়া প্রত্যেকটি রকেটেরই অভিযান শেষ হয় না। কখনও কখনও, এর বিচ্ছিন্ন অংশগুলি বছরের পর বছর ধরে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মহাকাশের শূন্য মাধ্যাকর্ষণে ভেসে বেড়াতে থাকে। বর্তমানে স্পেসএক্স-এর এমনই একটি রকেটের (SpaceX Rocket) ওপরের অংশটি আগামী বুধবার, ৫ই আগস্ট চাঁদে (Moon) আঘাত হানতে চলেছে। এই অপরিকল্পিত সংঘর্ষটি মহাকাশ বিজ্ঞানীদের চিন্তায় ফেলেছে এবং ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযান নিয়েও নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মহাকাশ পর্যবেক্ষণ বিশেষজ্ঞ বিল গ্রে জানিয়েছেন, স্পেসএক্স রকেটের এই অংশটি চাঁদের আইনস্টাইন ক্রেটারের (Einstein Crater) কাছে ঘণ্টায় প্রায় ৮,৭০০ কিলোমিটার গতিতে এসে ভেঙে পড়বে। এই আঘাত এতটাই শক্তিশালী হবে যে এর শক্তি প্রায় তিন টন টিএনটি (TNT) বিস্ফোরণের সমান বলে অনুমান করা হচ্ছে।
কীভাবে পথভ্রষ্ট হল স্পেসএক্স-এর রকেট?
২০২৫ সালের ১৫ই জানুয়ারি এই রকেটের অংশটি দুটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত চন্দ্রাভিযানের জন্য উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেসের (Firefly Aerospace) ব্লু ঘোস্ট (Blue Ghost) ল্যান্ডারটি সফলভাবে চাঁদে অবতরণ করলেও, অন্যদিকে জাপানি কোম্পানি আইস্পেসের (ispace) ল্যান্ডারটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। অভিযান শেষে এই রকেটের অংশটিকে একটি নিরাপদ কক্ষপথে বা সূর্যের কক্ষপথে পাঠানো যেত, কিন্তু সেটা কোটা সম্ভব হয়নি। এরপর এই রকেটের অংশটি প্রায় দেড় বছর ধরে মহাকাশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘুরে বেড়িয়েছে এবং এখন চাঁদের সাথে সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই দুর্ঘটনাটি স্পেসএক্সের পরিকল্পনার অংশ ছিল না। এটি আসলে ক্রমবর্ধমান অনিয়ন্ত্রিত মহাকাশ বর্জ্যের (Space Debris) কারণ।
A discarded SpaceX rocket is about to slam into the moon at 5,400 mph: The upper stage will strike near Einstein crater at 5,400 mph, carving a crater and sending up a plume scientists hope to study https://t.co/p9XdYRdg6Y pic.twitter.com/XbrZuneR8w
— Quartz (@qz) July 31, 2026
আরও পড়ুন: ডায়নোসরদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া উল্কাটিকে চেনা গেল এতদিনে, আলোড়ন বিজ্ঞানীমহলে
কীভাবে বিপদ বাড়াচ্ছে মহাকাশ বর্জ্য?
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই সংঘর্ষটি এই মুহূর্তে কোনও বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনছে না, তবে এই ঘটনা একটি বৃহত্তর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করছে। বিল গ্রে বলছেন, মহাকাশে বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। লস অ্যালামোস ন্যাশনাল ল্যাবের বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফার্নান্দোর মতে, যদিও সাম্প্রতিক সংঘর্ষটি সেভাবে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে না, কিন্তু আগামী দিনের যখন চাঁদে মাবনঘাঁটি তৈরি হবে, তখন এই ধরনের মহাকাশ বর্জ্যের হানা আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তিনি জানান ভবিষ্যতের মহাকাশচারী ও চন্দ্রঘাঁটিগুলির ওপর এই ধরনের সংঘর্ষ কি প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোঝার জন্য এই ঘটনাটিকে অধ্যয়ন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চাঁদে স্পেসএক্স-এর রকেটের অংশের সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া গর্তটি ২৭ – ৩০ মিটার চওড়া এবং ৫ মিটার গভীর হতে পারে। যদিও পৃথিবী থেকে এটি দেখা যাবে না, তবে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করা স্যাটেলাইটগুলি এর ছবি তুলতে পারবে। নাসার লুনার রিকনসান্স অরবিটার (LRO) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দানুরি অরবিটার (Danuri Orbiter)-এর তোলা ছবিগুলি দিয়ে সংঘর্ষের আগের ও পরের অবস্থা তুলনা করা যাবে। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে যে এরকম বড় ধরনের সংঘর্ষের পর চাঁদের ওপর ধুলো এবং ধ্বংসাবশেষ কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: মহাশূন্যে ইতিহাস ভারতের, সরকারি সাহায্য ছাড়াই মহাকাশে উপগ্রহ স্থাপনে সফল বিক্রম-১
প্রসঙ্গত, পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণ করা মহাকাশযানের ধ্বংসাবশেষ দুর্ঘটনাক্রমে চাঁদের মাটিতে আছড়ে পড়ার ঘটনার এটাই প্রথম দৃষ্টান্ত নয়। ২০২২ সালে একটি অচল চীনা রকেটের অংশও চাঁদের দূরবর্তী অংশে আঘাত করে দুটি গর্তের সৃষ্টি করেছিল। এটি নথিভুক্ত হওয়া এরকম দ্বিতীয় ঘটনা হতে চলেছে। যদিও, অ্যাপোলো অভিযানের সময় চাঁদে ভূমিকম্পের প্রাবল্য কেমন হতে পারে, তা বোঝার জন্য নাসা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছিল।