অনন্যা সরকার, কলকাতা: শিক্ষক দিবসে রাজ্য সরকার তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ বিদ্যাসাগর সম্মানে ভূষিত করেছিল। তার কিছুদিন পর সেই শিক্ষকই (Teacher) সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সহজপাঠ কার লেখা? কোথায় জন্মেছিলেন বিদ্যাসাগর?- এই ধরনের সাধারণ প্রশ্নগুলোর ভুল উত্তর দিয়ে প্রচুর মানুষের কটাক্ষ ও উপহাসের পাত্র হচ্ছেন। তিনি হলেন মালদহের কাদিরপুর কিরণময়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তনয় কুমার মিশ্র। সমাজ মাধ্যমে ট্রোলিংয়ের শিকার হওয়া এই শিক্ষকের বড় ছেলে ঋতবান মিশ্র এবার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে একটি দীর্ঘ পোস্ট শেয়ার করেছেন। জানিয়েছেন, একটি ভিডিওর একটি ছোট অংশ দেখেই মানুষ তাঁর বাবাকে বিচার করছেন, তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন ও তাঁর অবদান নিয়ে এখন আর কেউ কিছুই বলছে না। এই ঘটনা তাঁদের পরিবারের ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছে, তাও ব্যক্ত করেন ঋতবান তাঁর পোস্টে।
শিক্ষকের ভাইরাল ভিডিও নিয়ে তোলপাড় সোশ্যাল মিডিয়া
সম্প্রতি ঘটছে ঘটনাটি। কাদিরপুর কিরণময়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দীর্ঘ ১১ বছরের প্রধান শিক্ষক তনয় কুমার মিশ্র তখন পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস করাচ্ছিলেন। এমন সময় সংবাদমাধ্যমের কিছু কর্মী সেখানে পৌঁছান। ক্যামেরার সামনে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয় ‘সহজ পাঠ’ কে লিখেছেন। উত্তরে শিক্ষক বলেন “বিদ্যাসাগর”। এরপর তাঁর কাছে বিদ্যাসাগরের পুরো নাম ও পদবি জানতে চাওয়া হয়, তিনি সেই তথ্যও সঠিকভাবে বলতে পারেননি। অবশেষে, ব্ল্যাকবোর্ডে ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ লিখতে বলা হলে, তিনি ‘ঈশ্বরচন্দ্র’-এর প্রথম অক্ষর ‘ঈ’-এর পরিবর্তে ‘ই’ লেখেন এবং ‘বিদ্যাসাগর’-এর পরিবর্তে ‘বিদ্যাসগর’ লেখেন। এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তেই নিন্দার ঝড় ওঠে সমাজ মাধ্যমে। সরকারের তরফে এই শিক্ষককে বিদ্যাসাগর সম্মানে কিভাবে ভূষিত করা হল, তাই নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
এই সমস্ত বিতর্কের মাঝেই এবার মুখ খুললেন তনয় মিশ্রর বড় ছেলে ঋতবান মিশ্র। তিনি বলেন তিনি ছোট থেকে বাবার কাছেই পড়াশোনা করেছেন। তাঁর কাছেই হাতেখড়ি। আজ তাঁর শিক্ষক বাবাকে যেভাবে মানুষের উপহাস, কটাক্ষ ও অপমান সহ্য করতে হচ্ছে, তা তাঁর কাছে খুবই বেদনাদায়ক। দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, “ছোটবেলা থেকে বাবার কাছেই পড়েছি। বাবা শুধু আমার বাবা নন, আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক। অ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত বাবার কাছেই শিখেছি। ছোটবেলা থেকেই ১ থেকে ২৫ পর্যন্ত নামতা মুখস্থ ছিল। এমনকি ঘুমের মধ্যেও তুলে যদি জিজ্ঞাসা করা হতো, ১৪ গুণ ৪ কত, সঙ্গে সঙ্গে বলে দিতে পারতাম ৫৬।” তাঁর কথায়, “সত্যি বলতে আজ হয়তো আমরা নিজেরাও সবকিছুর উত্তর দিতে পারব না। সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই নয় কি? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু ভুলে যাওয়া, সব প্রশ্নের উত্তর সবসময় মনে না থাকা, এটা তো মানুষেরই স্বাভাবিক ব্যাপার।”
আরও পড়ুন: তিস্তার স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল খুদে হাতি, মৎস্যজীবীদের তৎপরতায় সন্তানকে ফিরে পেয়ে খুশি মা
বাবার প্রসঙ্গে ঋতবান বলেন, “বাবা একজন শিক্ষক। তাঁর কাছে ছাত্রছাত্রীদের শেখানোর দায়িত্ব আছে। কোথাও ভুল হলে প্রশ্ন করা যেতে পারে, সমালোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু একজন মানুষকে হঠাৎ ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করা, সেই মুহূর্তের কিছু ভুলকে কেন্দ্র করে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করা এবং তারপর সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে অপমান করা, এটা কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল?” আজ যারা তনয় বাবুকে উপহাস করছেন, তাঁদের সামনে হঠাৎ মাইক ধরে ক্রমাগত প্রশ্ন করে গেলে তাঁরা সাবলীলভাবে সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবেন কিনা, তাই নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন ঋতবান।
যারা উপহাস করছেন তাদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন তনয়বাবু জ্যেষ্ঠ পুত্র, “যাঁরা এত কথা বলছেন, তাঁদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন। হঠাৎ আপনাদের কাউকে স্কুলে গিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করা হলে আপনারা কি প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন?” ঋতবান জানান তার ছোট ভাই ঋতনীল উচ্চমাধ্যমিকে চমৎকার ফল করে এখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি নিয়ে পড়ছেন। এর পিছনে তনয়বাবুর অবদান অনেকখানি। কিন্তু এখন পরিচিত মানুষরাও সবকিছু ভুলে উপহাসকারীদের দলেই যোগ দিয়েছে, যা ঋতবান ও তাঁর গোটা পরিবারের কাছে খুবই বেদনাদায়ক।
আরও পড়ুন:এক মাসও ঢোকেনি অন্নপূর্ণা যোজনা, মন্ত্রীকে ঘিরে বিক্ষোভ বিজেপি কর্মী মহিলাদের
ঋতবান লেখেন, “আজ বুঝলাম, সোশ্যাল মিডিয়া যেমন মানুষের ভালো দিকটা দেখাতে পারে, তেমনই এর আড়ালে মানুষের নিষ্ঠুর দিকটাও খুব সহজে বেরিয়ে আসে। ভালো সময়ে পাশে থাকা মানুষ অনেক। খারাপ সময়ে পাশে থাকা মানুষ গোনা যায়। আজ সেই মানুষগুলোকে আমরা চিনে গেলাম। আমি আমার বাবাকে নিয়ে লজ্জিত নই। আমি গর্বিত।” সবশেষে ঋতবান বলেন, ভুল হলে অবশ্যই বলবেন, প্রশ্ন তুলবেন, সমালোচনাও করবেন। কিন্তু একজন মানুষকে অপমান করার আগে মনে রাখা উচিত, তাঁরও একটা পরিবার আছে, সন্তান আছে। তাঁরও একটা সম্মান আছে।