আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে (West Bengal) শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন শিল্পনীতি (Industrial Policy) নিয়ে এগোনো শুরু করেছে রাজ্য সরকার (Government of West Bengal)। দুর্গাপুজোর আগেই নতুন নীতি কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ইতিমধ্যেই নীতির খসড়া নিয়ে Group of Ministers (GoM)-এর আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, GoM নতুন শিল্পনীতিতে অনুমোদন দিয়েছে। বিনিয়োগ সামলানোর পাশাপাশি শিল্পের জন্য জমির জোগান সহজ করা, যাতে প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলিতে সহজে অনুমোদন পাওয়া যায় সেই দিকটা দেখা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার পরিবেশ আরও সহজ করাই এই নীতির অন্যতম লক্ষ্য।
শিল্পনীতির সবচেয়ে বড় প্রস্তাব
নতুন শিল্পনীতির অন্যতম বড় প্রস্তাব হল ১০০ কোটি বা তার বেশি বিনিয়োগের প্রকল্পগুলির জন্য বিশেষ সিঙ্গল-উইন্ডো ব্যবস্থা। এই ধরনের বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে একাধিক দফতর, পুরসভা বা পঞ্চায়েতে আলাদা আলাদা ভাবে ঘুরে অনুমোদন নিতে গিয়ে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। এই সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন, জমির ব্যবহার পরিবর্তন বা ল্যান্ড কনভারশন, মিউটেশন, ট্রেড লাইসেন্স-সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় অনুমোদনকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, এর ফলে প্রকল্প শুরু করার আগে প্রশাসনিক জটিলতা ও সময়ের অপচয় কমবে।
শুধু অনুমোদন নয়, শিল্পের জন্য জমির ব্যবস্থা করাও নতুন নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতদিন কোনও বড় শিল্পপ্রকল্পের ক্ষেত্রে জমি জোগাড় করতে গিয়ে একাধিক মালিকের জমি একত্র করা, বিভিন্ন আইনি জটিলতা এবং পরিকাঠামোর সমস্যার কারণে সময় লেগেছে। নতুন ব্যবস্থায় সরাসরি জমি কেনা এবং ল্যান্ড পুলিং এই দুই পদ্ধতিকেই গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন মালিকের জমি একত্র করে বড় শিল্পপ্রকল্পের জন্য উপযুক্ত জমি তৈরি করার পথও খোলা রাখতে চাইছে সরকার।
এর পাশাপাশি শিল্পের জন্য তৈরি হচ্ছে আরও বড় Land Bank-এর পরিকল্পনা। ২ অক্টোবরের রিপোর্ট অনুযায়ী, বন্ধ Central PSU, State PSU, অসুস্থ বা বন্ধ শিল্প সংস্থা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কিছু বেসরকারি সংস্থা, জুট ও কটন মিলের অব্যবহৃত জমিকে একত্র করে শিল্পের কাজে ব্যবহারযোগ্য জমির ভাণ্ডার তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে। ‘Project BhoomiShakti’-র আওতায় বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত জমি চিহ্নিত ও পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই জমিগুলির ক্ষেত্রে আইনি সমস্যা, দখল-সংক্রান্ত জটিলতা-সহ বেশ কিছু বিষয় এখনও সমাধান করতে হবে বলে শিল্প দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে।
সরকারের শিল্পবান্ধব পরিকল্পনার বাস্তব দিকটিও ইতিমধ্যে সামনে এসেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ৩৩টি শিল্পপ্রকল্পের জন্য প্রায় ৫৮০ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলিতে মোট আনুমানিক ₹৬০ হাজার কোটি বিনিয়োগ এবং প্রায় ৬২ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা, সৌরশক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ওষুধ, ইস্পাত, টেক্সটাইল, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং MSME-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রকল্পগুলি ছড়িয়ে রয়েছে।
এই প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে কেবল জমি বরাদ্দ করেই বিষয়টি শেষ করতে চাইছে না সরকার। বরাদ্দ করা জমি যাতে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত না থাকে, সে জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শর্তও রাখা হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, জমি পাওয়ার পর অর্থের সংস্থান, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত অনুমোদন, নির্মাণকাজ এবং শেষ পর্যন্ত উৎপাদন শুরু এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে কর্মসংস্থানের সঙ্গে আর্থিক সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ৫,০০০ কোটির একটি ইনসেনটিভ ফ্রেমওয়ার্ক-এর কথাও জানানো হয়েছে, যেখানে কোনও প্রকল্প কত কর্মসংস্থান তৈরি করছে, তার সঙ্গে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধার বিষয়টি যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ফলে শুধু বড় অঙ্কের বিনিয়োগ নয়, প্রকল্পগুলি বাস্তবে কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করছে, সেটিও নীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হতে চলেছে।
আরও পড়ুন: মেলা প্রদর্শনীতেও তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, বড় পদক্ষেপ ইডির
সব মিলিয়ে, নতুন শিল্পনীতির মূল লক্ষ্য শুধু নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা নয়, বরং জমি পাওয়া থেকে শুরু করে অনুমোদন, পরিকাঠামো এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন পুরো প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সমন্বিত করা। বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য ₹১০০ কোটির সীমা ধরে সিঙ্গল-উইন্ডো ব্যবস্থা, সরাসরি জমি কেনা ও প্রয়োজনের সেই জমির বিস্তার ঘটানো, অব্যবহৃত শিল্পজমি নিয়ে ল্যান্ড ব্যাংক এবং কর্মসংস্থান-ভিত্তিক ইনসেনটিভ এই একাধিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজ্যে শিল্পের নতুন কাঠামো তৈরি করতে চাইছে সরকার।