আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: শাসক দল বদলের পর বাংলার উন্নয়নকে নতুন দিশা দিতে একাধিক ক্ষেত্রে উদ্যোগী হয়েছে বিজেপি সরকার। রাজ্যের শহরগুলিকে আরও পরিষ্কার, সুন্দর ও আধুনিক করে তোলার লক্ষ্যেই এবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (Waste Management) থেকে শুরু করে নগর পরিকাঠামোর উন্নয়নে একাধিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই উন্নয়ন উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে, পশ্চিমবঙ্গে (West Bengal) প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে স্কাইম্যাক্স ইনফ্রা পাওয়ার লিমিটেড (Skymax Infra Power Ltd)। এই নিয়ে রাজ্যের নগরোন্নয়ন ও পুর বিষয়ক দফতরের সঙ্গে সংস্থাটির একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সল্টলেকের নগরায়ণ দফতরে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পলের উপস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য কী?
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য শহরের জমে থাকা কঠিন বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে কম্প্রেসড বায়োগ্যাস তৈরি করা। সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকাগুলিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকাঠামো এবং বায়োগ্যাস তৈরির কারখানা গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হবে। এজন্য বর্জ্যকে তার ধরন অনুযায়ী আলাদা করা হবে এবং উপযুক্ত বর্জ্যকে জ্বালানিতে রূপান্তরিত করা হবে। এর ফলে একদিকে যেমন শহরের আবর্জনা থেকে তৈরি হওয়া স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সমস্যা কমবে, অন্যদিকে বর্জ্যকেও ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানো যাবে। সংস্থার চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর অর্জুন রাওয়াত জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই বিনিয়োগের ফলে রাজ্যে প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। প্রাথমিকভাবে ৩,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও ভবিষ্যতে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ এগোতে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে সংস্থার মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত বিনিয়োগ বর্তমানে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। সংস্থার বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশ ও ওড়িশাতেও তারা বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করেছে এবং সেখানে ইতিমধ্যেই কাজ এগোচ্ছে।
আরও পড়ুন: ছুটিতে বাড়ি ফিরে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু, কর্মক্ষেত্রে ফেরা হলো না নদিয়ার অগ্নিবীর জওয়ানের
শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই নয়, কলকাতা ও বিধাননগরের সৌন্দর্যায়ন এবং নগর পরিকাঠামোর উন্নয়নেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই কাজের জন্য নর্থ ইন্ডিয়া টেকনিক্যাল কনসালটেন্সি অর্গানাইজেশন লিমিটেড পরামর্শ প্রদান করে প্রকল্প তৈরিতে সহায়তা করবে বলে জানা যাচ্ছে। পরিকল্পনার আওতায় রয়েছে প্রধান রাস্তা, রাস্তার মাঝের অংশ, উদ্যান, হ্রদ, ঐতিহ্যবাহী এলাকা এবং বিভিন্ন জনপরিসরের উন্নয়ন। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঝুলে থাকা টেলিফোন ও যোগাযোগের তার সরানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পলের বক্তব্য, শহরকে সুন্দর করে তুলতে শুধু বাইরের সাজসজ্জা যথেষ্ট নয়, ভিতরের পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর দিতে হবে। তাই সবার আগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিয়েই সামগ্রিক উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, কলকাতার যানজট ও গাড়ি রাখার সমস্যার সমাধানে বহুতল গাড়ি পার্কিং তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে কোথায় কতগুলি পার্কিং তৈরি হবে, তা এখনই চূড়ান্ত করা হয়নি। প্রথমে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলির বর্তমান পরিকাঠামো, জমির প্রাপ্যতা এবং সম্ভাব্য স্থানগুলি খতিয়ে দেখে সমীক্ষা করা হবে। এরপর প্রকল্পের সংখ্যা, ব্যয় এবং কাজের সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে। রাস্তা ও জনপরিসরের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পুরনো পরিকাঠামো পুরোপুরি বদলে ফেলার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে সংস্কার করা হবে। সব মিলিয়ে, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শহরের সৌন্দর্যায়ন, এই তিনটি ক্ষেত্রকে সামনে রেখে বাংলার নগর উন্নয়নে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হয় এখন সেটাই দেখার বিষয়।