আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়া বা নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে পশ্চিমবঙ্গে তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ ট্রাইবুনাল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে কলকাতা হাই কোর্টের তত্ত্বাবধানে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে মোট ১৯টি অ্যাপিলেট ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়ায় যাঁদের নাম বাদ পড়েছিল, তাঁদের আবেদনের ভিত্তিতে পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি খতিয়ে দেখাই ছিল এই ট্রাইবুনালগুলির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সেই ট্রাইবুনাল থেকেই এবার সরে দাঁড়ালেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু (Biswajit Basu)। শনিবার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগেকে চিঠি দিয়ে পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন তিনি।
কেন পদত্যাগ করলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি?
বিশ্বজিৎ বসুর পদত্যাগের পিছনে নির্দিষ্ট কোনও কারণ বিস্তারিতভাবে প্রকাশ্যে আসেনি। তবে তাঁর এই সিদ্ধান্তের ফলে SIR ট্রাইবুনালের বিচারপতিদের সরে দাঁড়ানোর ঘটনা নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। এর আগে কলকাতা হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নামও এই প্রসঙ্গে উঠে এসেছিল। শিবজ্ঞানম ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব ছেড়েছিলেন। অন্যদিকে, ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় ট্রাইবুনালের কাজ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছিলেন।
কেন দায়িত্ব ছাড়তে চেয়েছিলেন আগের বিচারপতিরা?
প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার কথা জানিয়ে ট্রাইবুনাল থেকে সরে দাঁড়ান। অন্যদিকে, ইন্দ্রজিৎ চ্যাটার্জির ক্ষেত্রে উঠে এসেছিল যাতায়াতের সমস্যা। সল্টলেক থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জোকায় ট্রাইবুনালের দফতরে প্রতিদিন যাতায়াত করতে দীর্ঘ সময় লাগত তাঁর। রাস্তার বেহাল অবস্থা এবং যানজটের কারণে যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল। পাশাপাশি, বিপুল সংখ্যক মামলার চাপও ছিল। বাড়ির কাছাকাছি কোনও জায়গায় শুনানির ব্যবস্থা অথবা বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি। সেই ব্যবস্থা না হলে দায়িত্ব ছাড়ার কথা জানিয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।
এভাবে একের পর এক বিচারপতির সরে দাঁড়ানোর ঘটনায় প্রশ্নের মুখে ট্রাইবুনালের কাজের গতি। কারণ, ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক আবেদনের নিষ্পত্তি বাকি রয়েছে। অক্টোবর মাসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯টি ট্রাইবুনালের মধ্যে ১৭টি কাজ করছিল। সেখানে প্রায় ৩৮.৩১ লক্ষ আবেদনের মধ্যে ১.২৬ লক্ষের কিছু বেশি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছিল। বাকি প্রায় ৩৭.০৫ লক্ষ আবেদন তখনও ঝুলে ছিল। ফলে বিচারপতির সংখ্যা কমে গেলে এবং নতুন করে দায়িত্ব বণ্টন করতে হলে মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ভোটার তালিকায় নাম ফেরানোর অপেক্ষায় থাকা আবেদনকারীদের জন্য নিঃসন্দেহে এটি দুঃসংবাদ।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-পাকিস্তান থেকে আসা সংখ্যালঘুরা পাবে নাগরিকত্ব, দিনক্ষণ ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
অন্যদিকে, ট্রাইবুনালের কাজের পরিকাঠামো এবং অনলাইন ব্যবস্থাও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় উঠে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে ডিজিটাল স্বাক্ষর সংক্রান্ত সমস্যার কারণে বিচারপতিদের নির্দেশ আপলোডের কাজেও বাধা তৈরি হয়েছিল বলে খবর। সম্প্রতি সেই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে একদিকে বিপুল সংখ্যক আবেদনের চাপ, অন্যদিকে বিচারপতিদের সরে দাঁড়ানোর ঘটনা, সব মিলিয়ে SIR ট্রাইবুনালের কাজ কত দ্রুত এগোয়, এখন সেদিকেই নজর অপেক্ষারত জনগণের।