অনন্যা সরকার, দিল্লি: কথায় বলে ধৈর্য ও নিষ্ঠার সাথে করা কাজের ফল সবসময়ই ভালো হয়। দিল্লির ‘মাদার টিচার’ সুমন গোয়েলের সাফল্যের কাহিনীটি এরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত (Success Story of Teacher Suman Goel)। ছোটবেলায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ তাঁর পরিবারের কাছে ছিল না। কিন্তু সেই প্রবল আর্থিক সংকটের মধ্যেও সুমন নতুন পথের সন্ধান করে নেন। শিক্ষিকা হিসেবে তাঁর এই যাত্রা ও ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি তাঁর অবদান তাঁকে এনে দিয়েছে রাজ্য ও জাতীয় স্তরের স্বীকৃতি। আসুন তাঁর জীবন সংগ্রাম ও জয়ের গল্পটি নেওয়া যাক।
বাড়ি ছেড়ে দিল্লি এসে নিজের হাতেই গড়েন নিজের ভাগ্য
হরিয়ানার জিন্দ জেলার জুলানা গ্রামের বাসিন্দা সুমন গ্রামের বিদ্যালয় থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ছোটবেলায় তিনি ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু দশম শ্রেণির পর আর্থিক সমস্যার কারণে চলে আসতে হয় দিল্লি। সুমন ২০০২ সালে দ্বাদশ শ্রেণি পাস করেন। তবে পরিবারের অভাব-অনটন তখনও লেগেই ছিল।
সুমন গোয়েল দিল্লির নর্থ ওয়েস্ট বি-১-এর রোহিনী এলাকার পুথ কালানে অবস্থিত সর্বোদয় কন্যা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে স্কুলের মধ্যে প্রথম স্থানও অধিকার করেছিলেন। এরপর তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্মীবাই কলেজে বিএ ডিগ্রির জন্য ভর্তি হন। তবে স্নাতক পড়ার সময় নিজের খরচ চালানোও তাঁর কাছে কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তখন তিনি সেই স্কুলেই আবার ফিরে আসেন যেখান থেকে তিনি দ্বাদশ শ্রেণির পড়াশোনা সম্পন্ন করেছিলেন।
আরও পড়ুন: RBI-র চাকরি সামলে UPSC ক্র্যাক, কোচিং ছাড়াই প্রথম অ্যাটেম্পটে IAS সৃষ্টি
২০০৪ সালে এই স্কুল থেকেই শিক্ষক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। তখন তিনি মাসে প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৩০০ টাকা আয় করতেন। অর্থাৎ তাঁর দিনপ্রতি আয় ছিল মাত্র ৬০ টাকা, যা দিয়ে তিনি কলেজের বেতন পরিশোধ করতেন। এরপর সুমন তাঁর স্কুলের শিক্ষকদের কথা শুনে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন। ২০০৯ সালে তিনি একটি স্থায়ী সরকারি চাকরি পান এবং ২০১৩ সাল থেকে তিনি একই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি জানান যে, পুরোনো স্কুলে ফিরে আসাটা শুধু একটা পেশাগত সিদ্ধান্ত ছিল না, এটি ছিল সেই প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসা, যে প্রতিষ্ঠান তাঁর জীবন গড়ে তোলায় বিশাল অবদান রেখেছে।
ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে সুমনের সম্পর্ক শুধু পড়ুয়া-শিক্ষিকার নয়, বরং তিনি মায়ের মতো ভালোবাসা ও যত্ন নেন সমস্ত শিক্ষার্থীর। সুমন জানান, তিনি স্কুলের সব বাচ্চাদের পরিবারকে চেনেন, যা তাঁকে আরও ভালোভাবে তাদের বুঝতে ও শেখাতে সাহায্য করে। পুথ কালান, কৃষ্ণ বিহার এবং মাঙ্গে রাম পার্কের মতো এলাকা থেকে আসা বেশিরভাগ শিশুই তাদের পরিবারের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। তাদের বাবা-মায়েরা দিনমজুরের কাজ করেন। তাই এই শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝাটা বিশেষভাবে জরুরি। তিনি শুধু তাদের শিক্ষার ওপরই মনোযোগ দেন না, তারসাথে দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা শিশুদের জন্য শীতের পোশাক, স্টেশনারি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থাও করেন।
আরও পড়ুন: IIT থেকে UPSC, কোচিং ছাড়াই প্রথম প্রচেষ্টাতেই সফল হয়ে আজ IAS শ্রেয়া
অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারানোর পর, বিয়ের পর সুমন তার স্বামী গৌরবের কাছ থেকে এবিষয়ে পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন। জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারের দুই-তিন মাসব্যাপী আবেদন প্রক্রিয়ার জন্য তাঁর স্বামী বাড়িতেই আইটি সুবিধার ব্যবস্থা করেন এবং তাঁকে আবেদন করার জন্য উৎসাহিত করেন। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর, দিল্লির রোহিনীর জিএসকেভি পুথ কালান স্কুলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সুমন গোয়েল ২০২৬ সালের জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞান ভবনে তাঁকে সম্মানিত করা হবে। প্রসঙ্গত, এর আগে ২০২২ সালে সুমন গোয়েল রাজ্য শিক্ষক পুরস্কারেও ভূষিত হন।