উপহাস করত গ্রামবাসী, কোচিং ছাড়া UPSC ক্র্যাক করে সবথেকে কম বয়সী IAS কৃষকের মেয়ে

অনন্যা সরকার, রাজস্থান: কোনো কিছু অর্জন করার প্রবল ইচ্ছা ও দৃঢ় সংকল্প থাকলে, সমাজের চোখরাঙানি হোক বা আর্থিক অনটন – কোনও বাধাই লক্ষ্যে পৌঁছানও থেকে আটকাতে পারে না। রাজস্থানের সাওয়াই মাধোপুর জেলার বাসিন্দা সুলোচনা মীনাও এই কথাটাই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন (UPSC Success Story of IAS Sulochana Meena)। মাত্র ২২ বছর বয়সে সুলোচনা প্রথম প্রচেষ্টাতেই দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা, ইউপিএসসি (UPSC)-তে উত্তীর্ণ হয়ে তাঁর গ্রাম থেকে প্রথম মহিলা আইএএস অফিসার হয়েছেন।

গ্রামের মানুষদের থেকে বাধা পেয়েও লক্ষ্য অর্জনের অদম্য জেদ

সুলোচনা সাওয়াই মাধোপুর জেলার যে গ্রামে বড় হয়ে উঠেছেন সেই গ্রামের বাসিন্দারা মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে খুবই রক্ষণশীল মানসিকতা পোষণ করতেন। কোনো মেয়ে দশম বা দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করলেই তাকে উচ্চশিক্ষিত বলে গণ্য করা হতো। গ্রামবাসীরা একথাটাই বলতো, “বেশি পড়াশোনা করে কী লাভ? শেষ পর্যন্ত তো বিয়ে করে পরের বাড়িতে চলে যেতেই হবে।”

সুলোচনার বাবা-মা কৃষিজীবী মানুষ, খুবই সাধারণ তাঁদের ছিল তাঁদের পরিবার। ছোট ভাইবোনদের মধ্যে বড় হওয়ায় সুলোচনার ওপর অনেক দায়িত্ব ছিল। যখনই কাউকে বলতেন যে তিনি একজন আইএএস অফিসার হতে চান, সবাই তাঁকে নিয়ে উপহাস করত এবং পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করারই পরামর্শ দিত। কিন্তু সুলোচনা মানুষের এই বিদ্রূপকেই নিজের শক্তিতে পরিণত করেছিলেন।

আরও পড়ুন: হার মানাতে পারেনি অভাব ও ব্যর্থতা, কোচিং ছাড়াই UPSC ক্র্যাক করে IAS কৃষকের কন্যা

দ্বাদশ শ্রেণিতে ভালো ফল করার পর, তার বাবা-মা তাকে সাহস করে উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লিতে পাঠান। সুলোচনা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কলেজ পড়াকালীনই তিনি এনএসএস (NSS)-এ যোগ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে, যখন গ্রামে গ্রামে ক্যাম্প হত ও তিনি মানুষকে সাহায্য করার জন্য যেতেন, তখন থেকেই সমাজসেবার প্রতি তাঁর সংকল্প আরও দৃঢ় হয়। সেখান থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, ইউপিএসসি-ই হবে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে সুলোচনা কোনো বড় ও ব্যয়বহুল কোচিং ইনস্টিটিউটে ভর্তি হতে পারেননি। সেল্ফ-স্টাডিকেই বেছে নেন। ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন। তিনি মক টেস্ট, ইউটিউব ও টেলিগ্রামে উপলব্ধ বিনামূল্যের স্টাডি মেটিরিয়াল ব্যবহার করে ইউপিএসসি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেন। প্রধানত এনসিইআরটি পাঠ্যবইয়ের ওপরই ভরসা রেখেছিলেন।

আরও পড়ুন: ফুটপাতে ব্যাগ বিক্রি করেন বাবা, চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও একসাথে NEET, JEE ও CUET ক্র্যাক ছেলের

সুলোচনা তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল পেলেন ২০২১ সালে। ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিসেস এক্সাম, ২০২১-এ সর্বভারতীয় স্তরে ৪১৫তম র‍্যাঙ্ক (AIR) এবং এসটি বিভাগে ৬ষ্ঠ র‍্যাঙ্ক অর্জন করে নেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি প্রথম চেষ্টাতেই আইএএস অফিসার হন। প্রশিক্ষণ শেষ করার পর যোগ দেন ঝাড়খণ্ড ক্যাডারে। সুলোচনার এই সাফল্য শেখায় কীভাবে সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক বাধাকে  পরোয়া না করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো যায়। তার এই যাত্রা আজ বহু মেয়েকে কিছু করে দেখানোর সাহস যুগিয়েছে।  

Leave a Comment