আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: আগে মানুষ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বই, সংবাদপত্র বা বিশেষজ্ঞদের কাছে যেত ডিকশনারি ব্যবহার করত। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। এখন কোনও বিষয় সম্পর্কে জানতে, নতুন কিছু শিখতে কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পেতে কয়েকটি শব্দ লিখলেই মুহূর্তের মধ্যে সামনে চলে আসে অসংখ্য ফলাফল। আর সেই কারণেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে গুগল (Google)। তবে ইন্টারনেটে পাওয়া সব তথ্য যে নিরাপদ বা বৈধ, তা কিন্তু নয়। বিশেষ করে অপরাধমূলক কাজ, নিষিদ্ধ বিষয়বস্তু কিংবা অন্যের ক্ষতি করতে পারে এমন তথ্য খোঁজার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। সার্চের মাধ্যমে বেআইনি বিষয়বস্তু দেখা, ডাউনলোড করা, সংরক্ষণ করা, ছড়িয়ে দেওয়া বা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করলে আইনি সমস্যা তৈরি হতে পারে। চলুন দেখে নেওয়া যাক ঠিক কী কী সার্চ করলে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
বোমা বা বিস্ফোরক তৈরির পদ্ধতি
বোমা, বিস্ফোরক বা বেআইনি অস্ত্র তৈরির পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় উপকরণ কিংবা ব্যবহারের নির্দেশিকা খোঁজা আপনার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ভারতে বিস্ফোরক ও অস্ত্র সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী বেআইনিভাবে বিস্ফোরক বা অস্ত্র তৈরি করা, মজুত রাখা, বিক্রি কিংবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। তাই অপরাধে সরাসরি ব্যবহার করা যেতে পারে এমন কিছু খোঁজা বা ব্যবহার করা থেকে দূরে থাকা উচিত।
হ্যাকিং ও ম্যালওয়্যার তৈরির তথ্য
সাইবার নিরাপত্তা শেখাটা দোষের কিছু নয়। তার জন্য বৈধ শিক্ষামূলক তথ্য অবশ্যই ব্যবহার করা যায়। কিন্তু কারও অ্যাকাউন্টে অনুমতি ছাড়া ঢোকা, পাসওয়ার্ড চুরি করা, অন্যের কম্পিউটার বা মোবাইল নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা ম্যালওয়্যার তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কাজের পদ্ধতি খুঁজে তা বাস্তবে প্রয়োগ করলে আইনি সমস্যা হতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে পরিচয় চুরি এবং কম্পিউটার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতারণার মতো অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।
শিশু যৌন নির্যাতনমূলক বিষয়বস্তু
শিশুদের যৌন নির্যাতন বা যৌন শোষণ সংক্রান্ত বিষয়বস্তু অত্যন্ত গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৭বি ধারায় শিশুদের নিয়ে তৈরি যৌন নির্যাতনমূলক বিষয়বস্তু দেখা, ডাউনলোড, তৈরি, প্রকাশ বা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। শিশু সুরক্ষা আইনের অধীনেও এমন বিষয়বস্তু সংরক্ষণ বা নিজের কাছে রাখার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তাই ভুলবশত এমন কোনও বিষয়বস্তু সামনে চলে এলে সেটি ডাউনলোড, সংরক্ষণ বা অন্য কাউকে পাঠানো উচিত নয়। বরং সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম বা সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত সরকারি ব্যবস্থায় বিষয়টি জানানো যেতে পারে।
পাইরেটেড সিনেমা, ওয়েব সিরিজ বা সফটওয়্যার
কম বেশি অনেকেই বিনামূল্যে সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, গান, বই কিংবা সফটওয়্যার ডাউনলোড করার জন্য অজানা ওয়েবসাইট খোঁজেন। কিন্তু অনুমতি ছাড়া কপিরাইট থাকা কোনও বিষয়বস্তু কপি, বিতরণ বা বেআইনিভাবে ব্যবহার আইনত অপরাধ। কপিরাইট আইনের আওতায় শাস্তিও হতে পারে। তাই অজানা ও বেআইনি ওয়েবসাইট থেকে সিনেমা বা অন্য কোনও কপিরাইটযুক্ত বিষয়বস্তু ডাউনলোড না করাই নিরাপদ।
পাসওয়ার্ড, ব্যক্তিগত তথ্য বা ব্যাংকিং তথ্য চুরি
অন্যের পাসওয়ার্ড, এককালীন পাসওয়ার্ড বা OTP, ব্যাংকিং তথ্য, কার্ডের তথ্য বা ব্যক্তিগত পরিচয় চুরি করার পদ্ধতি খোঁজা এবং তা ব্যবহার করা সাইবার অপরাধের অংশ। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে পরিচয় চুরি এবং অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। তাই কারও ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য কীভাবে হাতিয়ে নেওয়া যায়, সেই ধরনের নির্দেশিকা থেকে দূরে থাকা উচিত।
প্রতারণা ও ফিশিংয়ের কৌশল
ভুয়ো ওয়েবসাইট তৈরি করে কারও তথ্য নেওয়া, ভুয়ো বার্তা পাঠিয়ে পাসওয়ার্ড বা ব্যাংকের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া কিংবা অনলাইনে প্রতারণার কৌশল খুঁজে তা প্রয়োগ করাও গুরুতর বিষয়। গুগলে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে শিক্ষামূলক তথ্য খোঁজা এবং বাস্তবে প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে পদ্ধতি খোঁজা এক বিষয় নয়। উদ্দেশ্য ও ব্যবহারের ধরন এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সন্ত্রাসবাদ বা হিংসাত্মক অপরাধে সাহায্য করতে পারে এমন তথ্য
সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ, বিস্ফোরণ বা অন্য কোনও গুরুতর হিংসাত্মক অপরাধে সরাসরি সাহায্য করতে পারে এমন নির্দেশিকা খোঁজা, অথবা এই সংক্রান্ত প্রশিক্ষণমূলক তথ্যের অপব্যবহার গুরুতর আইনি সমস্যার কারণ হতে পারে। বেআইনি কার্যকলাপে সহায়তা, অর্থ জোগান বা নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যকলাপকে সাহায্য করার মতো বিষয় ভারতের বিভিন্ন আইনের আওতায় অপরাধ হতে পারে।
গর্ভপাত সংক্রান্ত তথ্যের যাচাই
গর্ভপাত সংক্রান্ত বিষয়টি কিন্তু আইনবিরোধী নয়। কিন্তু গুগলে যদি সার্চ করা হয় কীভাবে গর্ভপাত ঘটানো যায়, কী খেলে গর্ভপাত হতে পারে, বা গর্ভপাতের জন্য কোন ওষুধ ব্যবহার করা যায় তাহলে কিন্তু বিষয়টি স্পষ্টভাবে আইনের অবমাননা ঘটায়। মনে রাখবেন বিষয়টি সম্পর্কে জানা এবং বিষয়টিকে ব্যবহার করে ক্ষতি করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই সার্চে যদি এমন কোনও উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দেখা যায় তাহলে কিন্তু সর্বনাশ।
অন্যের ব্যক্তিগত বা গোপন ছবি ছড়ানোর তথ্য
কারও অনুমতি ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি সংগ্রহ, প্রকাশ বা ছড়িয়ে দেওয়ার পদ্ধতি খোঁজা থেকেও দূরে থাকা উচিত। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬ই ধারায় কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত অংশের ছবি তাঁর অনুমতি ছাড়া ধারণ, প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে।
শুধু সার্চ করলেই কি জেল হতে পারে?
এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা রয়েছে। গুগলে কোনও বিষয় লিখে সার্চ করলেই প্রত্যেক ক্ষেত্রে জেল হবে, এমন কোনও সাধারণ আইন নেই। কিন্তু সার্চের মাধ্যমে বেআইনি বিষয়বস্তু সংগ্রহ, ডাউনলোড, সংরক্ষণ বা ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা সেই তথ্য ব্যবহার করে অপরাধ করা হলে সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
আরও পড়ুন: এই কাজ না করলেই বাতিল হবে ড্রাইভিং লাইসেন্স
তাই গুগল ব্যবহার করার সময় শুধু কী সার্চ করছেন তা নয়, সার্চের পর কোন ওয়েবসাইটে ঢুকছেন এবং কী ধরনের বিষয়বস্তু ডাউনলোড বা সংরক্ষণ করছেন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি।