মায়ের হার্টের অসুখ, ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবা, পরিবার সামলে NEET ক্র্যাক নদিয়ার অলীকের

অনন্যা সরকার, নদিয়াঃ কঠিন পরিশ্রম করার মানসিক শক্তি ও দৃঢ় সংকল্প থাকলেই পৌঁছানো যায় অভীষ্ট লক্ষ্যে – সেটাই প্রমাণ করলেন নদিয়ার অলীক মণ্ডল (NEET UG 2026 Success Story of Alik Mondal)। সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা বা নিট (NEET)-এর মতো একটি কঠিন জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কোনো শিক্ষার্থীর কাছেই সহজ নয়, সেখানে যদি পড়াশোনার পাশাপাশি দারিদ্র্য, সংসারের দায়িত্ব এবং বাবা-মায়ের গুরুতর অসুস্থতার মতো বিষয়গুলোও সামলাতে হয়, তখন তা রীতিমত অগ্নিপরীক্ষা বলে মনে হয়। কিন্তু অলীক এই প্রতিবন্ধকতাগুলোকেই নিজের শক্তি বানিয়ে এবছর দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় NEET UG-তে ৫৭৩ নম্বর ও ২১,৮০১ সর্বভারতীয় র‍্যাঙ্ক (AIR)-এর সাথে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে তার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের দিকে এগিয়ে গিয়েছেন। 

দারিদ্র্য ও বাবা-মায়ের অসুস্থতা থেকে জন্ম নেয় ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন

নদিয়ার শান্তিপুরের বাসিন্দা অলিক অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে আর্থিকভাবে অসচ্ছলতার মধ্যে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর বাবা তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত, যা থেকে খুব সামান্যই আয় হয়। ছোটবেলায় অলীক নিজের চোখে তার মাকে হৃদরোগের সাথে সংগ্রাম করতে দেখেছেন, যা তার মধ্যে ডাক্তার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। কিন্তু প্রতিকূলতার এখানেই শেষ নয়।  অলীক যখন নিটের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তাঁর বাবার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। এই রোগের ব্যয়বহুল চিকিৎসা, হাজার রকমের টেস্ট এবং কেমোথেরাপির খরচ জোগাড় করতে তাঁর পরিবারের নাজেহাল অবস্থা হয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে, চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে বেচে দিতে হয় বাড়ির গরুও। পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করার জন্য অলীকের দাদা তাঁর পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

আরও পড়ুন: চরম আর্থিক অনটনের মধ্যে NEET-এ অসামান্য ফল প্রিয়ব্রতর, নবান্ন দিল সংবর্ধনা

অলীকও অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব ও বাবার চিকিৎসার ভার নিজের কাঁধে তুলে নেয়। সকাল-সন্ধ্যা মাঠে চাষের কাজ করা, গবাদি পশুদের দেখভাল করা আর বাবাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া তাঁর দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়। প্রতিনিয়ত হাসপাতালে এইভাবেই দৌড়ঝাঁপের কারণে তার পড়াশোনা প্রায় এক মাস পিছিয়ে যায়। এই পর্যায়ে এসে তিনি ভেবেছিলেন, এ বছর হয়তো তাঁর নিটের প্রস্তুতিই শেষ হবে না।

কিন্তু এত বাধার পড়েও হাল ছাড়েননি অলীক মণ্ডল। দিনরাত পরিশ্রম করে শেষ না হওয়া সিলেবাস সম্পূর্ণ করাতে পুরো মনোযোগ ঢেলে দেন। টেস্ট সিরিজ সমাধান করে এবং অনলাইন লেকচারগুলির সাহায্য নিয়ে প্রথম প্রচেষ্টায় ৪১০ নম্বর পাওয়ার পর, অলীক তার দ্বিতীয় অ্যাটেম্পটে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করে ৫৭৩ নম্বর অর্জন করেছেন।

আরও পড়ুন; আগস্টের মধ্যে; NEET মিছিলে সাংবাদিকদের হামলা নিয়ে রাজ্যকে নির্দেশ হাইকোর্টের

অলীক ঠিক করেন তিনি কলকাতার মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবেন, যাতে ডাক্তারি পড়াশোনার পাশাপাশি কলকাতায় বাবার ক্যান্সারের চিকিৎসাও করাতে পারেন এবং পরিবারের কাছাকাছি থাকতে পারেন। অলীক জানিয়েছেন, তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্যের পিছনে তার বাবা-মা, দাদা, স্কুল ও অনলাইন শিক্ষকদের প্রচুর অবদান রয়েছে। তাঁর এই সাফল্য গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা সেই সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের অনুপ্রাণিত করে, যারা দারিদ্র ও প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। 

Leave a Comment