সহেলি মিত্র, কলকাতা: রেল ব্যবস্থায় বিরাট চমক! এবার রাশিয়া থেকে সোজা ভারতে আসবে ট্রেন? শুনে চমকে গেলেন তো? তবে এমনই জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে সর্বত্র। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা ভাবনাচিন্তা করে রাশিয়া ভারতকে নজিরবিহীন প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতে সরাসরি রেলপথের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া (Russia India Train)। মধ্যপ্রাচ্য ও কৃষ্ণ সাগরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়েছে। সত্যিই কি তাই? চলুন বিষয়টি সম্পর্কে বিশদে জেনে নেওয়া যাক।
রাশিয়া থেকে সরাসরি ভারত অবধি ছুটবে ট্রেন?
সূত্রের খবর, এই রেল পরিষেবা শুরু করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো হরমুজ প্রণালীর সামুদ্রিক সংকট এড়ানো। রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। এই প্রকল্পের অধীনে, রেলপথটি রাশিয়া থেকে শুরু হয়ে তুর্কমেনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারত মহাসাগরের বন্দরগুলির সাথে সংযুক্ত হবে। রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কৌশলগত এই জলপথে চলমান সংকটের ঝুঁকি প্রশমিত করতে মস্কো ভারত মহাসাগর পর্যন্ত একটি রেল সংযোগ গড়ে তোলার সম্ভাবনা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। রাশিয়া মনে করে যে, ভারতে প্রবেশের সুযোগ করে দেয় এমন যেকোনো সম্ভাব্য রেল বিকল্প তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
আইএনএসটিসি অর্থাৎ আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর (INSTC) হলো রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যের জন্য একটি প্রতিষ্ঠিত বহু-লেনের পথ, যা ২০০০ সাল থেকে চালু রয়েছে। এই ৭,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ দিয়েই রাশিয়া ২০২৪ সালে ইরানের মধ্য দিয়ে ভারতে দুটি কয়লাবাহী ট্রেন পাঠিয়েছিল। এই পথটি রাশিয়াকে কাস্পিয়ান সাগর ও ইরানের বন্দরগুলোর (যেমন চাবাহার/আব্বাস) সাথে সংযুক্ত করে এবং ভারত মহাসাগরে গিয়ে মেশে, অন্যদিকে নতুন প্রস্তাবিত পথটি সম্পূর্ণরূপে স্থলভিত্তিক হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারত মহাসাগরের তীরে পৌঁছাবে।
রাশিয়ার কেন নতুন রেলপথের প্রয়োজন?
এখন প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ করে রাশিয়ার নতুন রেলপথ তাও আবার ভারতের সঙ্গে প্রয়োজন কেন? আসলে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো (ইইউ) রাশিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, রাশিয়া ভারত ও চীনের দিকে মনোযোগ দিয়েছে, যার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এমন নতুন পথের প্রয়োজন হয়েছে।
এছাড়াও আইএনএসটিসি-র বর্তমান পথটি ইরানের বন্দরগুলোর (যেমন বান্দার আব্বাস) দিকে যায়, যেগুলো বিপজ্জনক হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থিত। সেখানে হামলা, জাহাজ বাজেয়াপ্ত এবং জাহাজের ওপর উচ্চ বীমা প্রিমিয়ামের ঝুঁকি এড়াতে রাশিয়া স্থলভিত্তিক বিকল্প পথ খুঁজছে। যদিও রাশিয়া ২০২৪ সালে আইএনএসটিসি-র মাধ্যমে ভারতে কয়লা পাঠিয়েছিল, এই পথের নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার কারণে তারা এর ওপর শতভাগ নির্ভর করতে পারে না। রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরীয় বাণিজ্য পথটি তুরস্কের (ন্যাটো সদস্য) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যুদ্ধের কারণে এটি অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। উত্তেজনা বাড়লে তুরস্ক যেকোনো সময় পথটি বন্ধ করে দিতে পারে বা কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করতে পারে, তাই রাশিয়া সামুদ্রিক নির্ভরতা কমাতে চায়।
আরও পড়ুনঃ মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ছিল ২৫.৫ কোটি ইন্টারনেট ইউজার, এখন কত জানেন?
ভারতের কী লাভ হবে?
এখন প্রশ্ন হলো, এই রেলপথটি সম্পন্ন হলে ভারত কী কী সুবিধা পাবে? একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারত রাশিয়া থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৭ লক্ষ ব্যারেল তেল আমদানি করে। এটি ভারতের মোট অপরিশোধিত তেলের ৫০ শতাংশেরও বেশি। বর্তমানে চীন-এর পর ভারতই রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। ভারত ও রাশিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে (প্রায় ৮.৩ লক্ষ কোটি টাকা) উন্নীত করার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই পথটি নির্মিত হলে ভারত উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হবে। যুদ্ধের কোনো ঝুঁকি ছাড়াই অপরিশোধিত তেল, এলপিজি ও প্রাকৃতিক গ্যাস নিরাপদে পাওয়া যাবে।