অনন্যা সরকার, পূর্ব মেদিনীপুর: সততা ও নিষ্ঠার সাথে নেওয়া একটা ছোট্ট উদ্যোগও সফল ব্যবসায় পরিণত হতে পারে। যেমনটা হয়েছে পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাটের অরূপ কুমার ঘোষের ক্ষেত্রেও (Success Story of Marigold Farmer Arup Kumar Ghosh)। ফুল বাজারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুবাদে ফুল ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। ২০১০ সালে কমার্সে প্রথম বর্ষের পড়াশোনা শেষ করার পর, তিনি কলেজ ছেড়ে স্থানীয় ফুল বিক্রেতাদের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। পরের বছর হায়দরাবাদের গুডিমালকাপুর ফুল বাজারে কাজ করার সময় তিনি লক্ষ্য করেন যে, সেখানে কোলাঘাট থেকেই ফুল পাঠানো হচ্ছে। তখন ফুল ব্যবসায় বৃহৎ সম্ভাবনার দিকটি আন্দাজ করতে পেরে, তিনি বাড়ি ফিরে আসেন এবং নিজেই ফুল ব্যবসা শুরু করেন। আজ তাঁর মাসিক আয় পৌঁছেছে ৫০ লক্ষ টাকা। আসুন তাহলে অরূপ কুমার ঘোষের এই সাফল্যের কাহিনীটি জেনে নেওয়া যাক।
সামান্য বিনিয়োগ করে গাঁদা ফুলের ব্যবসা শুরু করেন অরূপ
প্রথমদিকে অরূপ কোলাঘাট বাজার থেকে গাঁদা ফুলের মালা কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে ভালো মুনাফা অর্জন করেন। তবে তিনি কেবল একজন বিক্রেতা হিসেবেই সন্তুষ্ট থাকতে চাননি। ২০১১ সালের শেষের দিকে তিনি ২ বিঘা জমি ইজারা নেন এবং গাঁদা ফুল চাষের জন্য প্রায় ১২,০০০ টাকা বিনিয়োগ করেন। তবে স্থানীয় প্রজাতির গাঁদা ফুলের গুণমান খারাপ হওয়ায় প্রথম প্রচেষ্টায় তাঁর বেশ লোকসান হয়। এরপর তিনি থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ব্লসম মার্কেটে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নেন এবং সেখান থেকে ‘টেনিস বল’ প্রজাতির উন্নত মানের গাঁদা ফুলের বীজ নিয়ে দেশে ফেরেন।
এই উন্নত জাতের ফুল গাছগুলির সঠিক পরিচর্যার ফলে ২০১২ সালে তিনি সফলভাবে ফসল ঘরে তোলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চাষ জমির পরিধি বেড়ে ৭৩ বিঘা, অর্থাৎ প্রায় ২৯.২ একরে দাঁড়িয়েছে। এখানে বর্তমানে তিনি লাল, হলুদ ও কমলা রঙের গাঁদা ফুল চাষ করেন। তবে শুধু ফুলই নয়, তিনি গাছের বীজ ও চারাও উৎপাদন করেন। ২০২৪ সালে তিনি প্রায় ৪ কোটি চারা এবং ১,৫০০ কেজি বীজ বিক্রি করেন, প্রতি কেজি বীজের দাম ছিল প্রায় ২৫,০০০ টাকা।
আরও পড়ুন: কোচিং ছাড়াই NEET ক্র্যাক, ডাক্তার হওয়ার পথে কালচিনির আদিবাসী কন্যা জেমিনা
মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, লখনউ, দিল্লি, কানপুর, অযোধ্যাসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও হায়দরাবাদে তাঁর উৎপাদিত বীজ ও চারার বেশ চাহিদা রয়েছে। ফসল তোলার মরশুমে অরূপবাবু প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১,০০০ কেজি গাঁদা ফুল বিক্রি করেন। মাত্র ৩ থেকে ৫ মাসের মধ্যে ফুল বিক্রি করে ১ থেকে ২ কোটি টাকা উপার্জন করেন তিনি। ২০২৫ সালে তাঁর বার্ষিক আয় প্রায় ৬.৩৫ থেকে ৭.৩৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ গড়ে মাসে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা। অরূপ তাঁর ফসলের মান বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত সূর্যালোক, উপযুক্ত জল নিকাশি ব্যবস্থা, ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যা থেকে সুরক্ষা এবং কীটপতঙ্গ প্রতিরোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
আরও পড়ুন: শীতে ডেস্টিনেশন হোক ভারতের গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন গান্ডিকোটা! কীভাবে যাবেন? রইল রুট
তবে অরূপ জানিয়েছেন যে, চাষজমিতে রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তে নিম তেল এবং গোবর সারের মতো প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করেন তিনি। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে তিনি তাঁর উৎপাদিত ফুলের বাজার সম্প্রসারিত করেছেন। বর্তমানে তাঁর ফার্মে ৮০ জন কর্মী কাজ করেন। অরূপ কুমার ঘোষের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, ধৈর্য, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ও সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার সাহায্যে ফুল চাষও একটি লাভজনক পেশা হয়ে উঠতে পারে।