অনন্যা সরকার, কলকাতা: বুধবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও মুখ্য সচিব মনোজ আগরওয়ালের সঙ্গে বৈঠক সারেন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের (Reliance Industries) প্রতিনিধি দলের কর্মকর্তারা। তাঁরা রাজ্যে একটি আধুনিক ডেটা সেন্টার এবং কয়লা গ্যাসিফিকেশন কেন্দ্র গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (Nuclear Power Project) স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন। অনুমান করা হচ্ছে যে, প্রস্তাবিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ছয় থেকে সাত বছরের মধ্যে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়ে আসতে পারে বাংলায়। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে যে, রিলায়েন্স পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির কাছে উপকূলবর্তী গ্রাম হরিপুরে এই কেন্দ্রটি স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে।
কেন হরিপুরে কারখানার প্রস্তাব তাৎপর্যপূর্ণ?
এই হরিপুরেই ১৫ বছর আগে নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড (NPCIL)-এর একটি ১,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। রাশিয়ার কারিগরি সহযোগিতায় এনপিসিআইএল এই ইউনিটটি নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ২০১১ সালের আগস্টে তৎকালীন তৃণমূল সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। স্থানীয় মৎস্যজীবী ও গ্রামবাসীদের আপত্তি ছিল এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নিয়ে, ২০০৯ সালে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার অন্তত তিন বছর আগে থেকেই তাঁরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন।
এক প্রশাসনিক কর্তা জানিয়েছেন, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি দল বুধবার নবান্নে মনোজ আগরওয়ালের সঙ্গে দু’ঘণ্টা ধরে বৈঠক করে এবং এরপর তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক সারেন। দলটির প্রস্তাবগুলোর মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ, সম্ভবত প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ আসতে পারে পশ্চিমবঙ্গে।
জানা গেছে, হরিপুরে এনপিসিআইএল-এর অনুমোদিত ২,০০০ একরের একটি জমি রয়েছে। অর্থাৎ, প্রকল্পটি বাতিল হওয়ার আগেই এনপিসিআইএল সেখানে ভূ-কম্পন, ভূ-প্রযুক্তিগত, আবহাওয়া ও পরিবেশগত সমীক্ষার মতো প্রয়োজনীয় সমীক্ষাগুলি সম্পন্ন করেছিল। তবে, ২০০৬ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে মৎস্যজীবী ও গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে যে তীব্র বিরোধিতা করা হয়, তা বিবেচন করে বর্তমান সরকার একটি বিকল্প স্থানের প্রস্তাব দিয়েছে, যেটি হল হলদিয়ার কাছে অবস্থিত নয়াচর। কিন্তু রিলায়েন্সের কর্মকর্তারা হরিপুরেই এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপনের ব্যাপারে আগ্রহী বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। এবার রাজ্য সরকার কি সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই দেখার।
আরও পড়ুন: ইডেনে মহালয়ার অনুষ্ঠানে থাকবেন না মোদী, শেষমুহূর্তে বড় বদল! আসতে পারেন ইনি
এছাড়া, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ কলকাতা, উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল এলাকা এবং সুন্দরবনে – তাদের হোটেল চেইন সম্প্রসারিত করার প্রস্তাবও দিয়েছে। এর পাশাপাশি সূত্র মারফত জানা গেছে, রিলায়েন্স তাদের প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারের একটি অংশের কাজ আগামী তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ডেটা সেন্টারের সম্পূর্ণ কাজ আগামী বছর জুনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। এটি হবে গুজরাটের জামনগরে তৈরি নির্মীয়মাণ কেন্দ্রটির মতোই অত্যাধুনিক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তিসম্পন্ন একটি কেন্দ্র।
আরও পড়ুন: LPG অতীত! পাইপের মাধ্যমে ৫০ লক্ষ পরিবারে পৌঁছবে গ্যাস, ঘোষণা সরকারের
উল্লেখ্য, রিলায়েন্স ‘কোল গ্যাসিফিকেশন’ বা কয়লা থেকে গ্যাস তৈরির প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগের আগ্রহও প্রকাশ করেছে। এই ক্ষেত্রে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। রাজ্য সরকার দেওচা-পাচামি প্রকল্পের ৩০ শতাংশ এলাকা ‘কোল গ্যাসিফিকেশন’- এর জন্য দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছে বলে জানান এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা। এছাড়া, রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ইসিএল (ECL)-এর পরিত্যক্ত কয়লাখনিগুলোতেও এই প্রকল্প শুরু করা হতে পারে।