অনন্যা সরকার, গোয়ালিয়র: আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য নিজে লেখা সম্ভব, তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন গোয়ালিয়রের বাসিন্দা সীমা বনসাল (Success Story of Seema Bansal)। মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েন তার পরিবার। অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে, বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার মতো টাকাও তার মায়ের কাছে ছিল না। বাড়ির একটা মাত্র সিলিং ফ্যান ১৭০ টাকায় বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন মা। সেই সীমাই আজ নিজের হাতে একটি প্যাকেজিং ব্যবসা চালান। আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং নিরন্তর কঠোর পরিশ্রম করে গড়ে তুলেছেন তার কোম্পানি, যার কার্যক্রম এখন ভারত ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও। নিষ্ঠা ও সংকল্পের জোরে তার সংস্থা, ডিসিজি টেক লিমিটেড (DCG Tech Limited) আজ ১৫৭ কোটি টাকার কোম্পানি।
সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার যাত্রা সহজ ছিল না
সীমা বনসালের শৈশব খুবই কষ্টের মধ্যে দিয়ে কেটেছে। বাবার মৃত্যুর পর তার মা একাই গান শিখিয়ে টাকা উপার্জন করে চার সন্তানকে বড় করেন। কিন্তু সন্তানদের উচ্চশিক্ষার খরচ বেড়ে যাওয়ায় তার মায়ের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন তিনি সীমাকে একটি সরকারি স্কুলে ভর্তি করান নিয়মিত স্কুল না গিয়েও ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করেন সীমা।
এর কিছুদিন পর সীমা তার ভাইয়ের সাথে মুম্বাই পাড়ি দেন। প্রথমে মাসির কাছে থাকতেন, কিন্তু তাদের সেখান থেকে চলে গিয়ে কাজ খুঁজতে বলা হয়। তারা একটি ছোট টিনের ঘরে থাকতে শুরু করেন। বিভিন্ন ছোটখাটো কাজ করতে করতে অবশেষে সীমা একটি আইটি কোম্পানিতে চাকরি পান, যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। অফিস থেকে তাকে লন্ডনে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয় এবং তিনি বিনা দ্বিধায় তা গ্রহণ করে।
লন্ডনে থাকাকালীন সীমা বিয়ে করেন। পরে স্বামীর সাথে চলে আসেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং ওয়াল স্ট্রিটের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং-এ একটি অফিস চালু করেন তার স্বামী। সীমা জানান, তার ব্যবসা ভালোই চলছিল, পাশাপাশি তিনি ব্যাংক অফ আমেরিকাতে চাকরি পান এবং গ্রিন কার্ডও পেয়ে যান তারা। কিন্তু কিছুদিন পর সীমার স্বামীর ব্যবসায় বিশাল লোকসান হয় এবং সবকিছু হারিয়ে ভারতে ফিরে আসতে হয় দুজনকে।
শুরু হল ডিসিজিপ্যাকস
সীমা জানান ভারতে ফিরে তার স্বামী অন্য একটি কোম্পানিতে কিছু টাকা বিনিয়োগ করলেন, তিনি তখন বেকার। তার হঠাৎই মনে পড়ে যায়, লন্ডনে তাদের বাড়িতে প্রতি মাসে একটি প্যাকেজিং ক্যাটালগ আসতো, সেটি দেখে প্রায়ই তিনি একটি প্যাকেজিং ব্যবসা শুরু করার কথা ভাবতেন। কিন্তু এটা শুধুই ভাবনা ছিল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিতে তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না এবং এই ক্ষেত্রটি সাধারণত পুরুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেখানে দাঁড়িয়ে বিনা অভিজ্ঞতায় সীমা শুরু করলেন ডিসিজি প্যাকস। আর আজ তার কোম্পানি যে সাফল্য অর্জন করেছে, তার জন্য সীমা বনসাল অন্যদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছেন।
আরও পড়ুনঃ ঘরের পাখা বেচে বাবার শেষকৃত্য করেছিলেন মা, আজ মেয়ে ১৫৭ কোটির কোম্পানির মালিক
সীমা বনসাল তার বাড়ির একটি ছোট ডেস্ক থেকে সবকিছু নিজের হাতে শুরু করেন। গাড়ি চালানো, প্রোডাক্ট বিক্রি করা, হিসাব রাখা এবং ব্যবস্থাপনার সমস্ত দায়িত্ব একাই পালন করতেন। তার কঠোর পরিশ্রমে কোম্পানিটির আজ বার্ষিক টার্নওভার ১৫৭ কোটি। ভারতের প্যাকেজিং শিল্পে ডিসিজি প্যাকস একটি বড় নাম হয়ে উঠেছে। তিনি ৫০,০০০-এরও বেশি গ্রাহককে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত প্যাকেজিং সরবরাহ করেন।