অনন্যা সরকার, কলকাতা: তিল তিল করেই গড়ে তোলা যায় স্বপ্নের সাম্রাজ্য। এমনটাই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন কলকাতার উদ্যোক্তা মেঘা সারায়ান (Success Story of Megha Sarayan)। সম্প্রতি নিজের বেকারি ব্র্যান্ড ‘মজ’ (Modge)-কে নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন জনপ্রিয় টিভি শো শার্ক ট্যাংক ইন্ডিয়া সিজন ৫ (Shark Tank India Season 5)-এর মঞ্চে। শুধু তাই নয় তার পরিশ্রম, বিপণন কৌশল ও সেলসের জোরে ১ কোটি ফান্ডিংও পেয়েছেন মেঘা, যার বিনিময়ে ৯% মালিকানা সত্ত্ব দিতে হয়েছে তাকে। শাদি ডট কম ও পিপলস গ্রুপের ফাউন্ডার, অনুপম মিত্তল (Anupam Mittal) ‘মজ’-এ বিনিয়োগ করেছেন। আসুন জেনে নিই কেমন করে শুরু হল তার এই বেকারি ব্র্যান্ডের যাত্রা।
ছোট প্রয়াস হয়ে উঠলো বড় ব্র্যান্ড
মেঘার সফলতার কাহিনী কোনো বিশাল ফ্যাক্টরি বা বড় ইনভেস্টমেন্ট থেকে শুরু হয়নি, বরং একটি ছোট কলেজ প্রজেক্ট থেকেই তার বেকারি খোলার প্রতি আগ্রহের সূত্রপাত হয়। পড়াশোনা চলাকালীন এক ওয়ার্কশপে তিনি প্রথমবার কেক বানান। এরপর তিনি তার প্রোডাক্টটি জোম্যাটো (Zomato)-তে লিস্ট করেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে খুব দ্রুত তার কাছে অর্ডার আসতে শুরু করে।
এর থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন যে, বর্তমানে অনলাইন বেকারি মার্কেটে ভালো ও নির্ভরযোগ্য অপশন খুব কমই রয়েছে। এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ২০১৮ সালে মাত্র ৫,০০০ টাকা বিনিয়োগ করে তিনি “ল্যান্ড অফ কেকস” (Land of Cakes) নামে একটি বেকারি ব্র্যান্ড শুরু করেন। ছোট্ট ছোট্ট ধাপ পেরিয়ে মেঘার ব্যবসা এখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। শুরুটা হয়েছিল মাত্র ১৫০ স্কোয়ার ফুটের একটি ছোট কিচেন থেকে, যেখান থেকে তিনি প্রতিদিন প্রায় ২০ করে অর্ডার ডেলিভারি করতেন।
কোভিড মহামারির সময় তার ব্যস্ততা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তখন তিনি দিনে প্রায় ৪০ টি করে কেক বানাতে শুরু করেন। পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে গেছেন মেঘা, কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি এমবিএ ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে তার ব্যবসায় মন দেন। তার এই সুস্বাদু বেকারি প্রোডাক্টগুলি মূলত রাতের বেলার ক্রেভিং, স্ট্রেসে মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা বা ছোটখাটো অনুষ্ঠান উদযাপনের উদ্দেশ্যে বানানো।
মেঘা কলকাতায় চারটি এবং হায়দ্রাবাদে একটি ক্লাউড কিচেন খুলেছেন। তার প্রথম ফিজিক্যাল আউটলেটটি খোলা হয়েছে কলকাতার কর্পোরেট হাব, সেক্টর ৫-এ। গত বছর তিনি ব্যবসাটির নাম পরিবর্তন করে ‘মজ’ রাখেন এবং জানুয়ারি মাসে অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টরদের কাছ থেকে ৭২ লক্ষ টাকা ফান্ডিং সংগ্রহ করেছেন। মজ বিভিন্ন মুডের চাহিদা মেটাতে ‘মি টাইম’ এবং ‘গ্লো আপ’-এর মতো প্রোডাক্ট অফার করে। ব্র্যান্ডটির বর্তমানে ৭০টি এসকেইউ (SKU) রয়েছে, যার মধ্যে ৩০টি পানীয় এবং বাকিগুলো বেকারি ও ডেজার্ট আইটেম।
ব্র্যান্ডটি মাস-প্রিমিয়াম সেগমেন্টে অবস্থান করে, এর কেকের দাম শুরু হচ্ছে ৬০০ টাকা থেকে, এক স্লাইস চিজকেক পাওয়া যায় ১৫০ টাকায় এবং ব্রাউনির দাম ৫০ টাকা। মজের সর্বাধিক বিক্রি হওয়া প্রোডাক্টগুলোর মধ্যে রয়েছে ডেট ওয়ালনাট কেক এবং বিভিন্ন ধরনের চিজকেক। উল্লেখযোগ্যভাবে, মজের মেনুতে থাকা সমস্ত আইটেমই নিরামিষ।
মেঘা সারায়ান শার্ক ট্যাংক ইন্ডিয়া সিজন ৫-এ ‘মজ’ (Modge) ব্র্যান্ডের জন্য পিচ করে শার্ক অনুপম মিত্তলের কাছ থেকে ৯% ইক্যুইটিতে ১ কোটি টাকার ফান্ডিং জিতে নিয়েছেন। মূলধনের বাইরেও, তিনি আশা করেন যে অনুপম মিত্তল তার ব্র্যান্ডকে অ্যাগ্রিগেটর প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আরও ভালো শর্তের সাথে আলোচনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলিতে কৌশলগত স্বচ্ছতা আনতে সাহায্য করবেন। ২৬ বছর বয়সে মেঘা ৩৫ জনের একটি টিমকে পরিচালনা করেন, যেখানে তার ভাই অপারেশন সামলান এবং তিনি ব্যবসার গ্রোথ ও ব্র্যান্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিকটি দেখেন। মেঘা সারায়ানের এই সাফল্যের কাহিনী প্রমাণ করে যে একটি শক্তিশালী আইডিয়া এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেলে ছোট একটি রান্নাঘর থেকেও বড় ব্র্যান্ড তৈরি করা অসম্ভব কিছু নয়।