অনন্যা সরকার, কেরালা: পরিস্থিতির শিকার হয়ে অনেক মানুষকেই তার স্বপ্নের পথ থেকে সরে আসতে হয়, আবার কিছু মানুষ আছেন যারা প্রতিকূল পরিস্থিতিকেই নিজেদের শক্তিতে পরিণত করেন। কেরালার শ্রীধন্য সুরেশের কাহিনীটি হল এরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত (UPSC Success Story of IAS Sreedhanya Suresh)। ওয়ানাডের কুরিচিয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত শ্রীধন্য, আর্থিক প্রতিবন্ধকতা এবং অত্যন্ত সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তাঁর পড়াশোনা কখনও থামাননি। ছোটবেলায় ৪ কিলোমিটার হেঁটে স্কুল গেছেন, অনেক কষ্ট সহ্য করে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছেন নিজের স্বপ্নের দিকে। ইউপিএসসি পাস করে আজ তিনি একজন সফল আইএএস (IAS) অফিসার। আসুন তাঁর এই সাফল্যের কাহিনীটি সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের মেয়ের সিভিল সার্ভিসে যোগদানের স্বপ্ন
শ্রীধন্য সুরেশ তাঁর শৈশব কাটিয়েছেন ওয়ানাডের কুরিচিয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল শোচনীয়, সংসার চালানোর জন্য তার বাবা-মা দিনমজুরের কাজ করতেন। তা সত্ত্বেও, তাঁরা তাদের সন্তানদের পড়াশোনাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। স্কুলে পৌঁছানোর জন্য শ্রীধন্যকে প্রতিদিন প্রায় ৪ কিলোমিটার হাঁটতে হতো। অত্যন্ত সীমিত সম্পদ নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন ছিল। কিন্তু তবু হার না মানা জেদ নিয়ে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন শ্রীধন্য।
পড়াশোনা শেষ করে শ্রীধন্য তফসিলি উপজাতি উন্নয়ন বিভাগে কাজ শুরু করেন। এই সময়ই তিনি প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও আধিকারিকদের কাজের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। তিনি ওয়ানাডের তৎকালীন সাব-কালেক্টর শ্রীরাম সাম্বসিবা রাও-এর প্রতি স্থানীয় জনগণের শ্রদ্ধা প্রত্যক্ষ করেন। সমাজে একজন সরকারি আধিকারিকের কাজের প্রভাব শ্রীধন্যকে মুগ্ধ করেছিল এবং এটাই সিভিল সার্ভিসে যোগদানের জন্য তার ইচ্ছাকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
আরও পড়ুন: UPSC-র জন্য ছেড়েছেন গুগলের মোটা বেতনের চাকরি, বিনা কোচিংয়ে র্যাঙ্ক ১, আজ IAS অনুদীপ
আইএএস অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখার পর, তাঁর আসল চ্যালেঞ্জ ছিল নিজের চেষ্টায় ইউপিএসসি-এর মতো কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। শ্রীধন্য সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন এবং লিখিত পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে ইন্টারভিউয়ের জন্য নির্বাচিত হন। তবে, ইন্টারভিউয়ের জন্য দিল্লি যাওয়ার খরচ তাঁদের সামর্থ্যের বাইরে ছিল। এই সময়ে এগিয়ে আসেন তাঁর বন্ধুরা এবং যাতায়াত ও ইন্টারভিউয়ে অংশ নেওয়ার জন্য প্রায় ৪০,০০০ টাকা শ্রীধন্যের হাতে তুলে দেন তারা। এই সমর্থনই তাঁকে পরবর্তী ধাপে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল।
শ্রীধন্যের দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের ফল মেলে এবং তিনি ২০১৯ সালে ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সর্বভারতীয় র্যাঙ্ক ৪১০ অর্জন করেন। অবশেষে পূরণ হয় তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। আর তার এই যাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এই যে, তিনি পরে সেই একই অফিসারের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন, যাঁর কাজ তাকে প্রশাসনিক চাকরিতে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। শৈশবের আর্থিক কষ্ট থেকে শুরু করে সিভিল সার্ভিসে সাফল্য ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন পর্যন্ত তাঁর এই যাত্রাপথ ছিল খুবই বন্ধুর। তবু হাল না ছাড়ার মানসিকতা ও বড় কিছু করার জেদ আজ শ্রীধন্য সুরেশকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। সামর্থ্য কম থাকা সত্ত্বেও যারা বড় লক্ষ্য অর্জনের স্বপ্ন দেখেন, সেইসব তরুণ-তরুণীদের কাছে তাঁর এই সাফল্যের কাহিনীটি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।