অনন্যা সরকার, কলকাতা: জীবনটা তাঁর সিনেমার মতো। দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে শৈশব। তার মধ্যেই চালিয়ে গিয়েছেন পড়াশোনা। তারপর চাকরির পরীক্ষার জন্য বাড়ি বসেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। যখন তাঁর বন্ধুরা কোচিং সেন্টারের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তখন টাকার অভাবে নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে ওঠেন তিনি। তার ওপর, ২০১৬ সালে তাঁকে বিনা অপরাধে জেলও খাটতে হয়েছিল। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, মোহন্ত হালদার অবশেষে নিজের যোগ্যতায় কলকাতা পুলিশে (Kolkata Police) কনস্টেবল পদে চাকরি পান। তবে এখানেই থেমে যায়নি তাঁর যাত্রা (Inspirational journey of Mohanta Haldar)। চাকরি পাওয়ার পরেও তিনি এমন কাজ করে চলেছেন, যা আজ বহু তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন পূরণ করেছে। চলুন জেনে নিই সেই শিক্ষকের কথা যিনি নিঃস্বার্থভাবে তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের তৈরি করছেন এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য।
বিনা পারিশ্রমিকে পুলিশের পরীক্ষার প্রশিক্ষণ দেন মোহন্ত
মোহন্ত হালদার বর্তমানে কলকাতা পুলিশের লেদার কমপ্লেক্স থানায় নিযুক্ত রয়েছেন। সরকারি চাকরি পাওয়ার পর আরামদায়ক জীবনযাপন করতে অনেকেই চান। কিন্তু তিনি হাঁটেন ভিন্ন রাস্তায়। শুরু করেন এক বিনামূল্যের কোচিং ক্লাস, যেখানে অবসর সময়ে বেকার যুবকদের পুলিশের চাকরির প্রশিক্ষণ দেন তিনি। এখনও পর্যন্ত মোট ২৩ জন তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে ২১ জন সম্প্রতি রাজ্য পুলিশে কনস্টেবল পদে চাকরিও পেয়েছেন। শিক্ষক হিসেবে মোহন্তর এই সাফল্যে খুশি তাঁর সহকর্মীরাও।
মোহন্ত জানিয়েছেন যে, তিনি ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষার (West Bengal Police Constable Recruitment Exam) জন্য নিজের উদ্যোগে ২৩ জনকে পরীক্ষার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষায় কীভাবে উত্তীর্ণ হতে হবে, সে বিষয়েও তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেন। কিন্তু এর বিনিময়ে তিনি একটা টাকাও নেননি।
আরও পড়ুন: রাজ্যে প্রায় ১০ কোটি মানুষের ABHA অ্যাকাউন্ট তৈরি, বড় মাইলফক অর্জন সরকারের
কখনও সোনারপুর তেমাথায় তাঁর বাড়িতে, আবার কখনও কলকাতার লেদার কমপ্লেক্স থানার অফিসে – যেখানে সুযোগ পেতেন সেখানেই ক্লাস নিতেন মোহন্ত। ফাইনাল পরীক্ষার আগে তিনি ১৫ নম্বরের একটি মক টেস্টেরও আয়োজন করেন। থানায় তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং অন্যান্য পুলিশ কর্তারাও তাঁকে সমর্থন জানিয়েছেন। লেদার কমপ্লেক্স থানার ওসি দীপঙ্কর বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানে মক টেস্টের আয়োজন করা হয়। ইন্টারভিউতে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করতে হয়, আত্মবিশ্বাসের সাথে কীভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় – সেই কৌশল শেখানো হয় পরীক্ষার্থীদের। আর এসবের ফলেই এই অসামান্য সাফল্য এসেছে।
আরও পড়ুন: কোচিংয়ের টাকা ছিল না, চাষ করে ইউটিউবে পড়াশোনা! পুলিশে চাকরি পেলেন রাজমিস্ত্রির ছেলে
মোহন্ত হালদার জানান যে, তাঁর বাবা-মা লেখাপড়া জানতেন না। টাকার অভাবে অনেক দিন অনাহারে কেটেছে তাঁর। অর্থের কারণে অনার্স পড়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ২০১৬ সালে কোনো দোষ ছাড়াই একটি ঘটনায় তাঁকে জেল খাটতে হয়েছিল। পরে আইপিএস অরিজিৎ সিনহার সাহায্যে তিনি সেই মামলা থেকে রক্ষা পান। মোহন্ত বলেন, অনেক কষ্টে তিনি পুলিশের চাকরি পেয়েছেন। তাই তিনি জানেন যে, সঠিক দিকনির্দেশনা না পেলে অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে চাকরির পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ে। সেই কারণেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, যতটা পারবেন আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পাশে থাকবেন। ডিউটির পর সময় বের করে তাদের পড়াতেন। আজ ২১ জন চাকরি পেয়েছে, এটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে জানান মোহন্ত হালদার।