৫ লাখে কিনতে চেয়েছিল সার্কাস, NEET ক্র্যাক করে আজ ডাক্তার গরিব কৃষকের ছেলে গণেশ

অনন্যা সরকার: গুজরাট: স্বপ্নপূরণের দৃঢ় সংকল্প থাকলে কারও ক্ষমতা নেই আপনাকে আটকানোর। গুজরাটের গণেশ বারাইয়ার (Inspirational Story of Dr Ganesh Baraiya) ক্ষেত্রেও কথাটা প্রযোজ্য। তিনি এখন সবার কাছে অনুপ্রেরণার আরেক নাম। ছোটো বেলায় গণেশকে ৫ লাখে কিনতে চেয়েছিল সার্কাস কোম্পানি। কিন্তু গরিব কৃষক বাবা টাকার লোভ না করে গণেশকে ডাক্তার করার স্বপ্ন দেখেন। যদিও গণেশের ক্ষেত্রে সেই পথ সহজ ছিল না। দীর্ঘ আইনি লড়াই জয় করে তিনি চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। কিন্তু কেন ডাক্তার হওয়ার জন্য আইনি লড়াই লড়তে হয়েছিল তাকে? এই জটিলতার সূত্রপাত হয় ২০১৮ সালে, যখন NEET ক্র্যাক করার পরেও মেডিকেল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (MCI) শুধুমাত্র তাঁর কম উচ্চতার কারণে তাঁকে এমবিবিএস (MBBS) কোর্সে ভর্তির সুযোগ দিতে অস্বীকার করে।

বামনত্বের শিকার গণেশের ডাক্তার হওয়ার লড়াই

বামনত্বের কারণে গনেশ বারাইয়ার মাত্র তিন ফুট উচ্চতা এবং ওজন ২০ কেজির কম। ৭২ শতাংশ শারীরিক অক্ষমতাতেও ভুগছেন তিনি। হাঁটাচলার ক্ষেত্রে তাঁর অসুবিধা রয়েছে। এমসিআই শুরুতে এই শারীরিক সীমাবদ্ধতাগুলোর কথা উল্লেখ করে তাঁকে জানায়, এগুলো তাঁর চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এতে হার মানেন না তিনি। উল্টে ডাক্তারি পড়েই ছাড়বেন, এমন সংকল্প করে। তালজার নীলকণ্ঠ বিদ্যাপীঠ থেকে হাই স্কুল পাস করা গনেশ তাই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করেন। 

আরও পড়ুন: ছয় বছর বয়সে হারান দৃষ্টিশক্তি! হার না মেনে দু’বার UPSC ক্র্যাক, আজ IAS অফিসার

প্রথমে তিনি গুজরাট হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন। এই কাজে তাঁকে সহায়তা করেছিলেন তাঁর স্কুলের অধ্যক্ষ ড. দলপতভাই কাটারিয়া।  তিনি আইনি লড়াইয়ের খরচ পর্যন্ত বহন করেন, যা ভাবনগরের ওই কৃষক পরিবারটির পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। যদিও হাইকোর্ট শুরুতে এমসিআই-এর সিদ্ধান্তই বহাল রাখে।  তবু গনেশ বারাইয়া তাঁর চিকিৎসক হওয়ার সংকল্পে অবিচল থাকেন।

তিনি সাময়িকভাবে বি.এসসি. (B.Sc.) কোর্সে ভর্তি হন এবং এই লড়াইকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যান। এই আবেদনের চার মাস পর সুপ্রিম কোর্টের তরফে রায় দেওয়া হয়, মাত্র তিন ফুট উচ্চতার কারণে গণেশকে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এই রায়ের ফলে তাঁর এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন ও চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়।

আরও পড়ুন: দায়ী একটি চেয়ার! ৩৮ মিনিট স্টেশনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল ট্রেন

আদালতের রায় বেরোনোর পর গনেশ বারাইয়া ২০১৯ সালে ভাবনগর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান এবং ভালোভাবেই তাঁর পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। রাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর গনেশ বারাইয়া এখন তাঁর স্বপ্নের পেশায় কাজ করতে পারছেন। তিনি জানান, গ্রামীণ এলাকার গরিব মানুষের চিকিৎসা করার ইচ্ছা তাঁর। সেখানেই চিকিৎসকের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। তিনি এখন কার্যত বিশ্বের সবচেয়ে কম উচ্চতার চিকিৎসক।

তবে, উচ্চতা-জনিত কারণে দৈনন্দিন জীবনে অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে। সেই প্রসঙ্গে গনেশ বলেন, রোগীরা শুরুতে তাঁর উচ্চতা দেখে কিছুটা অবাক হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা বিষয়টির সাথে মানিয়ে নেন। তিনি জানান, রোগীরা যখনই তাঁকে দেখেন, প্রথমে কিছুটা চমকে যান, কিন্তু পরে তারা তাঁকে চিকিৎসক হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনিও তাদের প্রাথমিক এই আচরণকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেন। এমনকি তিনি জানিয়েছেন, রোগীদের থেকে তিনি আন্তরিক ও ইতিবাচক আচরণই পেয়েছেন। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পৃথিবীতে নিজের কাজের ছাপ ফেলার ক্ষেত্রে গনেশ বারাইয়ার এই যাত্রা অদম্য মনোবল, দৃঢ় সংকল্প ও আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

Leave a Comment